হাসপাতালে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই আবার জেলে ফেরত পাঠানো হলো ইমরান খানকে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে ‘মেডিক্যালি ফিট’ ঘোষণা করেছেন চিকিৎসকরা।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোররাতে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে ইমরানের স্বাস্থ্য পরীক্ষার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এই বিবৃতিটি আসে।সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা বিবৃতিতে তথ্যমন্ত্রী তারার জানান, আদিয়ালা জেলে ফেরত পাঠানোর আগে হাসপাতালে ইমরানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়েছে।
“সুপ্রিম কোর্টের আদেশের আলোকে, ২০ ও ২১ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে বন্দিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ, একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং একজন চিকিৎসকসহ একদল যোগ্য ডাক্তার তার বিস্তারিত পরীক্ষা করেন এবং তাকে চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ ঘোষণা করেন।
চিকিৎসা পরীক্ষা ও চিকিৎসার সমস্ত পর্যায়ে তার বোন উজমা খান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হওয়ার পর, ২১শে আগস্ট সকালে আনুমানিক ভোর ৫টার দিকে তাকে আদিয়ালা জেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মন্ত্রী তার পোস্টে ইমরান বা শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের নাম উল্লেখ করেননি।
গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের জারি করা আদেশ মেনে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হাসপাতালে আনা হয়। পিতরাস বুখারি রোড দিয়ে হাতাকে সপাতালে আনা হয় এবং ১ নম্বর গেট দিয়ে তিনি প্রবেশ করেন। শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল ইসলামাদের সেক্টর এইচ ৮-এ- অবস্থিত, যেখানে বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তর রয়েছে।
পাকিস্তানের দৈনিক ডন জানায়, হাসপাতালের চারপাশে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। ভবনটির নিরাপত্তা নিরীক্ষার পর হাসপাতালের দিকে যাওয়ার রাস্তাগুলোতে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয় এবং চত্বরের ভেতরে ও বাইরে প্রায় ৮০০ কর্মী মোতায়েন করা হয়।
ইসলামাবাদ পুলিশের জারি করা নিরাপত্তা আদেশটি দেখতে পেয়েছে ডন, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের চারটি উদ্দেশ্য সাধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল--নাগরিকদের জীবন, সম্পত্তি ও মর্যাদা রক্ষা করা; সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা। ইসলামাবাদ পুলিশ প্রধান সৈয়দ আলি নাসির রিজভিও প্রস্তুতি তদারকি করতে দুইবার হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
এর আগে এই এলাকায় এমন কড়া নিরাপত্তা দেখা গিয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাওয়াজ শরিফের পানামাগেট মামলার শুনানির সময়, যা ফেডারেল জুডিশিয়াল একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল—এই হাসপাতাল থেকে যেটি সামান্য দূরেই অবস্থিত।
ইমরানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে আদিয়ালা জেলের সুপারিনটেনডেন্ট আদালতে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশনা আসে সুপ্রিম কোর্ট থেকে।ওই প্রতিবেদন অনুসারে, জেল প্রশাসন জানিয়েছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তার স্ত্রীকে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে এবং তাদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। মেডিকেল অফিসাররা দিনে তিনবার ইমরানের সাথে দেখা করেন, তার খাবার পরীক্ষা করেন এবং তার রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন ও অক্সিজেন স্যাচুরেশন রেকর্ড করেন।
তবে প্রতিবেদনের একটি সংযুক্তি থেকে জানা যায় যে, পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (পিআইএমএস)-এর ডাক্তার আখতার আলি বান্দেশাহ গত ১ অগাস্ট তাকে পরীক্ষা করেন এবং তার অনিয়ন্ত্রিত ও ওঠানামা করা রক্তচাপ, বুক ধড়ফড় করা, মাথাব্যথা এবং অস্থিরতার মতো উপসর্গগুলো লিপিবদ্ধ করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী তার এই উপসর্গ এবং মানসিক চাপের জন্য আংশিকভাবে দায়ী করেছেন তার স্ত্রী, পরিবার ও সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে অনিয়মিত সাক্ষাৎ এবং সংবাদপত্র ও টিভির অনুপস্থিতিকে ।
তার মানসিক চাপ কমানোর জন্য ডাক্তার কিছু পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে তার স্ত্রীর সাথে আরও ঘন ঘন সাক্ষাৎ এবং পড়ার জন্য বইয়ের ব্যবস্থা করা। তিনি সিটি করোনারি এনজিওগ্রাফি এবং রক্তচাপের ওষুধের মাত্রা বাড়ানোরও সুপারিশ করেন এবং উল্লেখ করেন যে ৭৩ বছর বয়সী নেতা জটিলতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ১০ অগাস্ট সুপ্রিম কোর্টকে জানানো হয়, মাথায় ভারিভাব ও বুক ধড়ফড় করার অভিযোগ করার পর পিআইএমএস-এর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি মেডিকেল বোর্ড তাকে পরীক্ষা করে। বোর্ডটি তার কারাবাসের দৈনন্দিন রুটিনে এক ঘণ্টা হাঁটা ও বিশ্রামের পাশাপাশি সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, টেলিভিশন এবং বই পড়ার সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করে।
বোর্ডটি তার পরিবারের সদস্য বা স্ত্রীর সাথে আরও ঘন ঘন যোগাযোগের সুপারিশও করে, এবং বলে যে এটি তার উদ্বেগ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। প্রতিবেদনে পিআইএমএস-এ তার চোখের চিকিৎসার কথাও উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয় যে জ্যেষ্ঠ চক্ষু বিশেষজ্ঞদের হস্তক্ষেপে তার দৃষ্টিশক্তি প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।
ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের টানাপোড়েন চলছে অনেক দিন ধরেই। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত না করা এবং তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তার কাছে যেতে না দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাবের জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করে আসছে বিরোধী দল। সরকার এই অভিযোগগুলো বরাবরই অস্বীকার করেছে।
২০২৩ সালের অগাস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেলে বন্দী আছেন ইমরান এবং দুর্নীতির অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ভোগ করছেন, যে অভিযোগগুলো তিনি ও তার দল অস্বীকার করে আসছে।
পাকিস্তানের হয়ে ৮৮ টেস্ট ও ১৭৫ ওয়ানডে খেলেছেন ইমরান। তাকে মনে করা হয় সর্বকালের সেরা পেসারদের একজন, সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক হিসেবে তিনি অবিসংবাদিত। ১৯৯২ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বিদায়ের দুয়ার থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইমরানের নেতৃত্বেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পাকিস্তান, যা এখনও ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি রূপকথা হয়ে আছে।